জরায়ু ক্যান্সারঃ নারী মৃত্যুর অন্যতম কারন !

মানসিক স্বাস্থ্য রোগব্যাধি স্বাস্থ্য সংবাদ

জরায়ুর ক্যান্সার যার ইংলিশ প্রতিশব্দ হলো Cervical cancer. বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার সংক্রান্ত একটি রোগ যা নারীদের মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। সার্ভিকাল ক্যানসার বিশ্বব্যাপী নারীদের মধ্যে চতুর্থ সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার যার প্রায় ৭০ ভাগই হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) দ্বারা  সংক্রমিত হয়। সার্ভিকাল ক্যান্সার হল সারভিক্সের আস্তরণে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি । এটি ঘটে জরায়ু নিচের অংশে যা  যোনির সাথে সংযোগ রক্ষা করে। জরায়ু হল মেয়েদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা যোনিকে জরায়ু প্রধান দেহের সাথে সংযুক্ত করে। জরায়ুর মুখের স্কোয়ামাস সেল থেকে ক্যান্সারটি বেশি হয়ে থাকে। ২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৫লক্ষ ৭০ হাজার মহিলা সার্ভিকাল ক্যান্সার এ আক্রান্ত
হয়েছেন যার মধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ ১১ হাজার নারী এ রোগে মারা গেছেন। ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ  অন ক্যান্সারের মতে প্রায় ৫০ মিলিয়নের বেশি বাংলাদেশী নারী সার্ভিকাল ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বছরে প্রায় ১৭,৬০৬ টি নতুন রোগী সংযুক্ত হচ্ছে এবং প্রায় ১০ হাজার ৩৬২ জন নারী মারা যাচ্ছেন।

জরায়ুর ক্যান্সারের কারনঃ
জরায়ুর ক্যান্সার শুরু হয় যখন জরায়ুমুখ  এবং যোনির সংযোগস্থলে সুস্থ  কোষগুলোতে মিউটেশন ঘটে এবং সুস্থ স্বাভাবিক কোষ চক্রকে  পরিবর্তন করে অস্বাভাবিক কোষের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটায় । এরপর অনিয়ন্ত্রিত কোষ নিজেদের মধ্যে প্রতিলিপি তৈরি করে এবং  ক্লাস্টার তৈরি হয় যা পরবর্তীতে  টিউমার গঠন করে। এই ক্যান্সার কোষ গুলো আশেপাশের টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করতে পারে এবং টিউমার থেকে ভেঙে শরীরের যেকোনো জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। জরায়ু ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হচ্ছে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস। পৃথিবীতে প্রায় ১৫০ টিরও বেশি এইচপিভি রয়েছে । এর মধ্যে এইচপিভি ৬ , এইচপিভি ১১ , এইচপিভি ১৬, এইচপিভি ১৮ স্ট্রেইনগুলো জরায়ু ক্যান্সারের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই ধরনের সংক্রমিত ব্যক্তিদের যৌনাঙ্গের উপর ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে অথবা কেউ কোনো উপসর্গও দেখাতে পারে না। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ১০ পার্সেন্ট পর্যন্ত বেশি থাকে।

জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণগুলো হলোঃ
 অল্প বয়সে বিয়ে করা
 অল্প বয়সে বাচ্চা নেওয়া
 ঘন ঘন বা অধিক বাচ্চা নেওয়া
 একাধিক ব্যক্তির সাথে যৌন মিলন করা
 কোন ব্যক্তির পূর্বের স্ত্রীর এই রোগ হয়ে থাকলে তার সাথে যৌন মিলন করা
 এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সাথে যৌন মিলন করা
 দুর্বল যৌনাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি
 পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুখে গর্ভনিরোধক বড়ি বা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন
করা
 ধূমপান করা
এছাড়া বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।

জরায়ুর ক্যান্সারের লক্ষনঃ
জরায়ু ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলো তেমনভাবে প্রস্ফুটিত হয় না। তবে কিছু কিছু
লক্ষণ এর মাধ্যমে তা জরায়ু ক্যান্সার বলে প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা যায়। লক্ষণ গুলি হলঃ
 অনিয়মিত মাসিক চক্র
 যৌন মিলনে সমস্যা
 যোনিপথে রক্তপাত ,সহবাসের সময় রক্তপাত
 মলত্যাগের সময় রক্তপাত
 অতিরিক্ত সাদা স্রাব যা দুর্গন্ধযুক্ত হতে পারে
 শ্রনী ব্যথা যা পিঠে ব্যথার সাথে সংযুক্ত হয়
 মলদ্বারে ব্যথা
 ক্ষুধামন্দা
 মূত্রনালীর সংক্রমণ
 ওজন কমে যাওয়া
 রক্তশূন্যতা
 শরীর দুর্বল লাগা
 কাশি হওয়া এবং কাশির সাথে রক্ত যাওয়া
 প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
 ডায়রিয়া হওয়া ইত্যাদি।

জরায়ু ক্যান্সার শনাক্তকরনঃ

 প্যাপ স্মেয়ার টেস্ট জরায়ু ক্যান্সার শনাক্তকরণে  অত্যন্ত সহজ  ও নির্ভরযোগ্য একটি পরীক্ষা। জরায়ু মুখ থেকে যে রস নিঃসৃত হয় তা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে ক্যান্সার হওয়ার পূর্ব্বাবস্থা ও জরায়ুমুখের অন্যান্য রোগ বিশেষ করে প্রদাহ শনাক্ত করা যায়। দু বছরে একবার 21 বছরের পর থেকে নারীদের এই স্মেয়ার টেস্ট পরীক্ষা করানো যেতে পারে এবং ৩০ বছরের নারীদের ক্ষেত্রে তা বছরে ৩ বার করানো উচিত।
 এছাড়া এইচপিভি ডিএনএ পরীক্ষা যা সংক্রমনের স্থায়িত্ব শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়।
 কল্পোস্কপি পরীক্ষার মাধ্যমে মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে সার্ভিকাল কোষের চাক্ষুষ পরিদর্শন করা সম্ভব
 বায়োপসি
 জরায়ু পরিদর্শন ইত্যাদি।
অবশ্যই জরায়ুর ক্যান্সার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত গাইনোকোলজিক্যাল চেকআপ এর গুরুত্ব অপরিসীম।

জরায়ু ক্যান্সারের প্রতিকারঃ
জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাধারণত চারটি স্তর রয়েছে। স্টেজের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয। প্রথম তিন স্টেজ এর ক্ষেত্রে রোগী রোগ পরীক্ষা না করালে বোঝা সম্ভব হয় না যে তার শরীরে ক্যান্সার রয়েছে । মূলত সার্জারি, রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি এ ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়। দ্রুত চিকিৎসা না করালে পরবর্তীতে কেবলমাত্র কেমোথেরাপি ও রেডিও থেরাপির মাধ্যমেই চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়। আমাদের দেশের বেশিরভাগ নারীরা সচেতনতার অভাবে জরায়ু ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে আসেন না যার কারণে জরায়ু কেটে দেওয়ার দরকার পড়ে। এতে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। নারীরা যদি সচেতন হয়ে তিন বছর পর পর সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে প্রদানকৃত ভায়া পরীক্ষা করাতো তাহলে ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে যাওয়া যেত এবং প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাওয়া নিশ্চিত হত। প্রাথমিক লক্ষণ এর ক্ষেত্রে ব্যথানাশক এন্টিবায়োটিক ও ব্লাড ট্রান্সফিউশন ইত্যাদি ব্যবস্থা নেওয়া হয় । সার্জারির মধ্যে Pelvic exenteration, Hysterectomy বিশেষভাবে কার্যকর। যে সার্জারি গুলো করা হয় সেগুলো অবশ্যই নিয়মিত ফলোআপ করতে হবে, তিন মাস অন্তর অন্তর প্রথম বছর এবং ছয় মাস অন্তর অন্তর পরের বছরগুলোতে নিয়মিত গাইনোকোলজিস্ট দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে ।

জরায়ু ক্যান্সারের প্রতিরোধঃ
এফডিএ ( ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) সংস্থা যেটি আমেরিকায় অবস্থিত সেটির নির্দেশনা মতে ৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রতিরোধক টিকা নেওয়া যায়। মোট তিনটি ডোজ রয়েছে। তাছাড়া এর পাশাপাশি কিছু আচরণগত ও সামাজিক প্রতিরোধক এর মাধ্যমে এই রোগটি প্রতিরোধ করা যায়। যেমনঃ
 ধূমপান বর্জন করতে হবে
 বাল্যবিবাহ রোধ করতে হবে
 অধিক সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত হতে হবে
 পান বা জর্দা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে

 ফল শাকসবজি তরকারি নিয়মিত খেতে হবে
 পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে
 সুশৃংখল ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে হবে ।

এছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি-নিষেধ গুলো যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে খুব সহজেই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে যে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীরা সংকোচের কারণে জরায়ু ক্যান্সারের কথা প্রকাশ করতে চান না ।  জরায়ু ক্যান্সার কোন ভয় নয় একমাত্র পরিবার এবং সামাজিকভাবে এই ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতাই পারে এ রোগের ক্ষেত্রে নারীর মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে এবং নারীকে একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।

লিখেছেনঃ
Ramisa Binti Mohiuddin
Department of Pharmacy (3rd Year)
Mawlana Bhashani Science and Technology University

রেফারেন্সঃ

1.
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.logintoheal
th.com/blog/bn/womens-health/what-is-cervical-cancer-in-
bengali/&ved=2ahUKEwi2hpf6jPbzAhXkwTgGHSwHAosQFnoECAMQAQ&usg=
AOvVaw3U6kKnF8Axv0ccM8Pb4nLp

2.
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://zeenews.india.c
om/bengali/health/know-the-alarming-signs-and-symptoms-of-cervical-
cancer_298928.html/amp&ved=2ahUKEwi2hpf6jPbzAhXkwTgGHSwHAosQFno
ECAoQAQ&usg=AOvVaw2xjzlNvUb_0Fb5YFiJAVkE&ampcf=1

3.
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://bengali.indianex
press.com/lifestyle/health-guide-all-you-need-to-know-about-cervical-cancer-
190444/lite/&ved=2ahUKEwi2hpf6jPbzAhXkwTgGHSwHAosQFnoECCUQAQ&u
sg=AOvVaw0il2bNYLJSklLMUKJ1x6e2&ampcf=1

4.
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://bn.m.wikipedia.o
rg/wiki/%25E0%25A6%259C%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25BE%25E0
%25A6%25AF%25E0%25A6%25BC%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25AE
%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%2596%25E0%25A7%2587%25E0%25A6
%25B0_%25E0%25A6%2595%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25AF%25E
0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B
8%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B0&ved=2ahUKEwi2hpf6jPbzAhXkwT
gGHSwHAosQFnoECB4QAQ&usg=AOvVaw0yp20xNbxWnbkbYfoZMlPI

5.
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.who.int/he
alth-topics/cervical-cancer&ved=2ahUKEwjol7-
yjfbzAhXjzjgGHbLEBmoQFnoECAQQBQ&usg=AOvVaw3ExPXzLQaZaBLpdUJ4
SrlS

6.
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.mayoclinic.
org/diseases-conditions/cervical-cancer/symptoms-causes/syc-
20352501&ved=2ahUKEwjO6PX_z_bzAhWnxDgGHXLDBhgQFnoECCkQAQ&u
sg=AOvVaw2RvQaxuptJl1ybDwAHDEHx

7.
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://obgyn.onlinelibr
ary.wiley.com/doi/full/10.1002/ijgo.13400&ved=2ahUKEwji5MGVlPbzAhW0umM
GHRPqDXQQFnoECAQQBQ&usg=AOvVaw30cb_AnVHlecDx3opVyJZM

1 thought on “জরায়ু ক্যান্সারঃ নারী মৃত্যুর অন্যতম কারন !

Leave a Reply

Your email address will not be published.