এন্টিবায়োটিক

রোগব্যাধি স্বাস্থ্য সংবাদ

মানব সৃষ্টির শুরু থেকেই বিভিন্ন রকমের জীবানু আমাদের দেহে বিভিন্ন রকমের রোগ সৃষ্টি করে আসছে। তার মধ্যে ব্যাকটেরিয়া অন্যতম যা বিভিন্ন সংক্রমণ যেমন, যক্ষ্মা, সিফিলিস, বাতজ্বর, নিউমোনিয়া, গনোরিয়া, ক্লামাইডিয়া, ব্যাকটেরিয়াল সেলুলাইটিস ইত্যাদির জন্য দায়ী। এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত এইসব জীবানুর সংক্রমণ বহু মানুষের প্রাণ নাশের জন্য সব থেকে বড় হুমকি ছিলো।
এন্টিবায়োটিক মূলত ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরকে ধ্বংস করে ব্যাকটেরিয়াকে নির্মুল করে অথবা ব্যাকটেরিয়ার মেটাবলিক রেট কে স্থবির বা বন্ধ করে দিয়ে ধীরে ধীরে ব্যাকটেরিয়া কে ধ্বংস করে দেয়। এজন্য এন্টিবায়োটিক কে এন্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্টস ও বলা হয়।
মানবদেহে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যাবৃদ্ধি এবং উপসর্গ সৃষ্টি করার আগে, দেহের ইমিউন সিস্টেম সাধারণত তাদের মেরে ফেলতে পারে। আমাদের দেহের শ্বেত রক্ত কণিকা শরীরের বাইরে থেকে আগত ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে এবং লক্ষণ দেখা দিলেও, ইমিউন সিস্টেম সাধারণত সংক্রমণ মোকাবেলা করতে পারে এবং লড়াই করতে পারে। তবে, ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা অত্যধিক হলে এবং ইমিউন সিস্টেম দূর্বল হলে তাদের সাথে আমাদের দেহ যুদ্ধ করতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে।

এন্টিবায়োটিকের ইতিহাসঃ

সর্বপ্রথম ১৯২৮ সালে “আলেকজান্ডার ফ্লেমিং” তার ল্যাবে দূর্ঘটনাবশতঃ এন্টিবায়োটিক “পেনিসিলিন” আবিষ্কার করেন। পেনিসিলিনের আবিষ্কারের পরও ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের চিকিৎসা হিসেবে পেনিসিলিনের ব্যবহার চালু হওয়ার জন্য এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল। এন্টিবায়োটিকসের প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়েছিলো ১৯৩০-এর দশকে। এবং সেই এন্টিবায়োটিকটি ছিলো “প্রন্টোসিল”, যা একটি সালফোনামাইড বা সালফা ড্রাগ। জার্মান জৈব রসায়নবিদ “গেরহার্ড ডোমাগক” ব্যাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য এটি তৈরি করেছিলেন।
১৯৪৫ সালে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের চিকিৎসা হিসেবে পেনিসিলিনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে চালু করা হয়। দুজন গবেষক ফ্লোরি এবং চেইনের গবেষণার মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছিল যারা দক্ষতার সাথে এন্টিবায়োটিক উৎপাদনকে বিশুদ্ধ ও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন । পেনিসিলিনের প্রবর্তন এন্টিবায়োটিকের তথাকথিত সুবর্ণ যুগের সূচনা করে। ১৯৪০ থেকে ১৯৬২ হচ্ছে এন্টিবায়োটিকের সোনালী যুগ। আজকে আমরা ঔষধ হিসেবে যেসব এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করি তার অধিকাংশই এই সময়ে আবিষ্কৃত হয়েছিলো এবং বাজারে আনা হয়েছিলো। সময় গড়ানোর সাথে সাথে এসব এন্টিবায়োটিকের নতুন সংস্করণ বের হয়েছে এবং নতুন নতুন সব এন্টিবায়োটিকও বাজারে এসেছে। এন্টিবায়োটিক গুলোর মধ্যে পেনিসিলিন আর সেফালোস্পোরিন উল্লেখযোগ্য যাদের উভয়কে মূলত বেটা-ল্যাক্টাম ড্রাগ ও বলা হয়। এছাড়াও বেশ কিছু এন্টিবায়োটিক আছে যেমন- টেট্রাসাইক্লিন, মনোব্যাকটাম, কার্বাপেনাম, এমিনোগ্লাইকোসাইডস ইত্যাদি।

এন্টিবায়োটিকের প্রকারভেদঃ

এন্টিবায়োটিক মূলত ছয় ধরণের।
১/ সেল ওয়াল সিন্থেসিস ইনহিবিটর।
যেমনঃ পেনিসিলিন, সেফালোস্পোরিন, কার্বাপেনাম ইত্যাদি।
২/ প্রোটিন সিন্থেসিস ইনহিবিটর।
যেমনঃ এমিনোগ্লাইকোসাইডস, টেট্রাসাইক্লিন, ম্যাক্রোলাইড ইত্যাদি।
৩/ ডিএনএ সিন্থেসিস ইনহিবিটর।
যেমনঃ ফ্লুরোকুইনোলোনস, মেট্রোনিডাজল ইত্যাদি।
৪/ আরএনএ সিন্থেসিস ইনহিবিটর।

যেমনঃ রিফামপিন।
৫/ মাইকোলিক এসিড সিন্থেসিস ইনহিবিটর।
যেমনঃ আইসোনায়াজাইড।
৬/ ফলিক এসিড সিন্থেসিস ইনহিবিটর বা এন্টিমেটাবোলাইটস।
যেমনঃ সালফোনামইডস, ট্রাইমিথোপ্রিম ইত্যাদি।

এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সঃ
বর্তমানে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার যে হারে বেড়েছে সেই সাথে গনহারে ডাক্তারদের বিনা পরামর্শে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার আমাদেরকে অনেক স্বাস্থ্য ঝুকিতেও ফেলছে। ধীরে ধীরে ব্যাকটেরিয়া গুলো এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট স্ট্রেইন তৈরী করছে। যার দরুন এখন এন্টিবায়োটিকের ব্যবহারও ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ কে থামাতে পারছে না। বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে মানুষ এখন অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে যা একটি মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। তারা আরও বিশ্বাস করেন যে এই অত্যধিক এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার দিকে অবদান রাখে যা এসব এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।

উপসংহারঃ
এন্টিবায়োটিক যেভাবে বহু যুগ ধরে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা দিয়ে আসছে, ঠিক তেমনি উল্টোদিকে বিনা পরামর্শে এর অত্যধিক/অপরিমিত ব্যবহারে আমাদের স্বাস্থ্য ঝুকিও বাড়ছে দিন দিন। তাই আমাদের সকলেরই উচিত ডাক্তার বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক সেবনে নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যদেরও সচেতন করা এবং কোনো এন্টিবায়োটিকের অত্যধিক/অপরিমিত ব্যবহার হতে বিরত থাকা।

লিখেছেনঃ
Rifat Newaz Turjoy
Department of Pharmacy (3rd Year)
Jahangirnagar University

Reference:
1/ An Introduction to Medicinal Chemistry, Fifth Edition-
Graham L. Patrick
2/ https://www.medicalnewstoday.com/articles/10278

3/
https://www.reactgroup.org/toolbox/understand/antibiotics/devel
opment-of-antibiotics-as-medicines/
4/ https://www.orthobullets.com/basic-science/9059/antibiotic-
classification-and-mechanism

5/
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Antibiotic

1 thought on “এন্টিবায়োটিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.