অ্যান্টিবায়োটিক -ই কি সকল সমস্যার সমাধান?

রোগব্যাধি স্বাস্থ্য টিপস স্বাস্থ্য সংবাদ

আমরা অধিকাংশ সময়েই জেনে না জেনে বিভিন্ন রোগের ( যেমন: জ্বর, ঠান্ডা) ওষুধ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক
সেবন করে থাকি। আসুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এর আদ্যোপান্ত…
● অ্যান্টিবায়োটিক কি?
যে কোনো পদার্থ যা ব্যাকটেরিয়ামের বৃদ্ধি এবং প্রতিলিপিকে বাধা দেয় বা সরাসরি মেরে ফেলে তাকে অ্যান্টিবায়োটিক বলা যেতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক হল ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সক্রিয় এক ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পদার্থ, যা অ্যান্টিসেপটিক ও ডিসইনফেকটেন্ট থেকে আলাদা।
অ্যান্টিবায়োটিকের শ্রেণীবিভাগ
কার্যকলাপের বর্ণালীর উপর ভিত্তি করে অ্যান্টিবায়োটিক তিন ধরনের।

  1. ন্যারো-স্পেকট্রাম এজেন্ট (যেমন, পেনিসিলিন জি) প্রাথমিকভাবে গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়াকে প্রভাবিত করে।
  2. ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক, যেমন টেট্রাসাইক্লাইন এবং ক্লোরামফেনিকল, গ্রাম-পজিটিভ এবং কিছু গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া উভয়কেই প্রভাবিত করে।
  3. বর্ধিত-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক, যা রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে, অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়াকেও প্রভাবিত করে, সাধারণত যেগুলি গ্রাম-নেগেটিভ। কিছু সচরাচর ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক হলো –
    Chloramphenicol, Ciprofloxacin,Clindamycin, Erythromycin, Azithromycin, Amoxicillin, Ampicillin, Penicillin G, Metronidazole ইত্যাদি।
    ● অ্যান্টিবায়োটিক কিভাবে কাজ করে?
    বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আছে, যেগুলো দুটি উপায়ে কাজ করে:
    ● একটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত অ্যান্টিবায়োটিক, যেমন পেনিসিলিন, ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে। এই ওষুধগুলি সাধারণত ব্যাকটেরিয়া কোষ প্রাচীর বা এর কোষের বিষয়বস্তু গঠনে হস্তক্ষেপ করে।
    ● অন্যদিকে ব্যাকটেরিওস্ট্যাটিক, ব্যাকটেরিয়াকে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে বাধা দেয়।
    ● আমরা ইতোম্যেই জানি যে, COVID-19 একটি ভাইরাসবাহী মহামারী যা SARS-CoV-2 ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে।
    তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, অ্যান্টিবায়োটিক কি ভাইরাসঘটিত রোগের বিরুদ্ধেও কর্যকারী???
    -দুঃখজনকভাবে উত্তরটি হলো “না”… এটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর নয়।
    ● অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা
    -ওষুধ শাস্ত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রবর্তন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিভাবে??
    ১৯৪৫-১৯৭২ এর মধ্যে,অ্যান্টিবায়োটিকগুলি সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য ব্যবহারের ফলে মানুষের গড় আয়ু আট বছর বেড়েছে।

যদি আমাদের কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক ফুরিয়ে যায়, আধুনিক ওষুধ কয়েক দশক পিছিয়ে যাবে। তুলনামূলকভাবে ছোট সার্জারি, যেমন অ্যাপেনডেক্টমির জন্যও জীবন হুমকিতে পরবে, যেমনটি ছিল অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগে। অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর খোলা কাটা অংশে প্রবেশ করা ব্যাকটেরিয়া থেক রক্তে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি হয়ে যাবে, এবং অনেক জটিল অস্ত্রোপচার তখন ডাক্তারদের দ্বারা করা সম্ভব নাও হতে পারে।এছাড়া যাদের দেহের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল তাদের অধিক সংখ্যক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে।
● এটা তো হলো গুণকীর্তন! এবার আসা যাক এন্টিবায়োটিকের কিছু ক্ষতিকর দিক নিয়ে…
-যে কোনও ওষুধের মতো, অ্যান্টিবায়োটিকগুলি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিকগুলি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সমস্যা সৃষ্টি করে না এবং গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বিরল।
● সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত:
ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, বমি, ফুসকুড়ি, পেট খারাপ, নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক বা দীর্ঘায়িত ব্যবহারের সাথে, এবং যোনির ছত্রাক সংক্রমণ।
● অ্যান্টিবায়োটিকের কম সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে:
I. সালফোনামাইড গ্রহণ করার সময় কিডনিতে পাথর তৈরি হয়।
II. সেফালোস্পোরিন গ্রহণ করার সময়, অস্বাভাবিক রক্ত জমাট বাঁধা।
III. টেট্রাসাইক্লাইন গ্রহণ করার সময় সূর্যালোকের প্রতি সংবেদনশীলতা।
IV. ট্রাইমেথোপ্রিম গ্রহণ করার সময় রক্তের ব্যাধি।
V. এরিথ্রোমাইসিন এবং অ্যামিনোগ্লাইকোসাইড গ্রহণ করার সময় বধিরতা।
গড়ে ১-১৫ জনের মধ্যে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হতে পারে, বিশেষ করে পেনিসিলিন এবং সেফালোস্পোরিন নামক এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে। হালকা থেকে মাঝারি অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সাধারণত “অ্যান্টিহিস্টামাইন” গ্রহণ করে সফলভাবে সরানো যেতে পারে।খুব বিরল ক্ষেত্রে, এটি গুরুতর অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়ায় (অ্যানাফিল্যাক্সিস) রূপ নিতে পারে, যা একটি জরুরী অবস্থা।
● এবার সবচেয়ে জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনার পালা আর তা হলো “অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও Superbugs”!!!
যখন আমরা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি তা দেহে প্রবেশকৃত ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে বা এদের রেপ্লিকেশনে বাঁধা দেয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি একটি ব্যাকটেরিয়াও বেচেঁ যায়, সেটি সেই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তখন একই ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা সেই রোগকে আর প্রতিহত করা যায় না। এই পরিস্থিতিকেই বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স।এইভাবেই যদি হাই ডোজের অ্যান্টিবায়োটিকগুলোও অকার্যকর হয়ে পরে তাহলে তা বৈশ্বিক মহামারী আকার ধারণ করে যা ‘Superbug’ নামেও পরিচিত।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আজ বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সংক্রমণ – যেমন নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, গনোরিয়া এবং সালমোনেলোসিস – চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে উঠছে কারণ তাদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকগুলি কম কার্যকর হয়ে উঠছে৷
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলে হাসপাতালে বেশি সময় থাকা, উচ্চ চিকিৎসা খরচ এবং মৃত্যুহার বেড়ে যায়। এভাবে চলতে থাকলে কোনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণকেই ভবিষ্যতে ঠেকানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।

!!!তবে এখন উপায়!!!
● অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিস্তার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে, আমরা যা যা করতে পারি:
I. একজন প্রত্যয়িত স্বাস্থ্য পেশাদার দ্বারা জরুরি হলেই শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা।
II. যদি স্বাস্থ্যকর্মী বলেন আপনার এগুলোর প্রয়োজন নেই তাহলে কখনোই অ্যান্টিবায়োটিকের দাবি
না করা।
III. অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করার সময় সর্বদা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুসরণ করা।
IV. অবশিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক শেয়ার বা ব্যবহার না করা।
রেফারেন্স:
I. https://www.cdc.gov/
II. https://www.who.int/
III. https://www.britannica.com/
IV. https://www.medicalnewstoday.com/
V. https://www.nhs.uk/
VI. https://microbiologysociety.org/

লিখেছেনঃ
Sanjida Islam Choiti
Department of Pharmacy (1st Year)
Mawlana Bhashani Science and Technology University

4 thoughts on “অ্যান্টিবায়োটিক -ই কি সকল সমস্যার সমাধান?

Leave a Reply

Your email address will not be published.